ঢাকা শেয়ার বাজার

১৪ জানুয়ারি ২০২৬ বুধবার ৩০ পৌষ ১৪৩২

শিশুবেলা ও আমার পহেলা বৈশাখ

সবার আগে শেয়ার বাজারের নির্ভর যোগ্য খবর পেতে আপনার ফেসবুক থেকে  “ঢাকা শেয়ার বাজার ডট কম” ফেসবুক পেজে লাইক করে রাখুন, সবার আগে আপনার ওয়ালে দেখতে। লাইক করতে লিংকে ক্লিক করুন  facebook.com/dhakasharebazar2024

বাংলাদেশ স্বাধীনের পরে, এই তো সেদিনের কথা। মনে পড়ে যায় আমার বাল্যকাল, চৈত্র মাস, ভয়াবহ সূর্যের তাপ। টিনের চালের উপরে লাল রঙ ধরা আতা পাকতে শুরু করেছে। ভরদুপরে ঘুমোনো একটা নিয়মিত অভ্যাসে পরিণত হয়েছিল। চৈত্র মাসের দ্বিতীয় সপ্তাহের শেষদিকে প্রায় প্রতিটা বাড়িতেই ঝাড়পোছ শুরু হয়ে যেত। কেননা বাঙালির সার্বজনীন উৎসব বাংলা নববর্ষ উদযাপনের প্রস্তুতি নেয়া হত কয়েক সপ্তাহ ধরে। পহেলা বৈশাখ বাঙালির প্রাণের উৎসব। ঘরের কুপি বাতি, লবণের বাটি থেকে শুরু করে সবকিছু ধুয়ে-মুছে পরিস্কার করা হত। বিগত দিনের সকল আবর্জনা জঞ্জাল পরিস্কার করে নতুন বছরকে বরণ করে নিতে বাঙালিরা প্রস্তুতি নিত। নতুন বছরের মঙ্গল কামনা করে বাড়িতে বাড়িতে জাগ দিত, মানে বাড়ির আশেপাশের ঝোপঝাড় জঙ্গল কেটে সাফ করে উঠানের পাশে ভুর করে রাখা হত, এরপরে সকাল ও সন্ধ্যা বেলায় নারিকেলের পাতা দিয়ে আগুন ধরানো হত। বাড়ির ছোট-বড় সকলে মিলে সেই ধোঁয়ার চতুর্দিকে ঘুরে ঘুরে ধোঁয়া মাখতো গায়ে আর বলতো:

‘জাগ-জাগ-জাগ-জাগ, আমাদের বাড়িতে জাগ,
রাজার বাড়ি ধনদৌলত আমাদের আমাদের বাড়িতে জাগ।
বিপদ-আপদ, রোগ-বালাই দূর হয়ে যাক।‘

ছন্দে ছন্দে সুর দিয়ে শিশু-কিশোর-যুবা-বুড়া সকলেই গাইতো সে গান। আর চৈত্র সংক্রান্তিতে অর্থাৎ চৈত্রের শেষদিনে তিতা সবজি দিয়ে তরকারি রান্না হত। বেতের আগা, বিভিন্ন ধরনের তিতা শাক, ডুমুর সহ প্রায় সাত-আট রকমের সবজি দিয়ে এই তিতা রান্না করা হত; এখনও বাংলা বছরের শেষ দিনে তিতা খেয়ে বছরকে বিদায় জানানো হয় বাংলা সংস্কৃতিতে।
পহেলা বৈশাখের দিন খুব ভোরবেলা ঘুম থেকে উঠে বাড়ির নারীরা জাগ পোড়ানো ছাই ফেলে দিয়ে পান্তা ভাতের পানি ছিটাত উঠোনে ও বাড়ির আশেপাশের খোলা জায়গায়। এরপরে স্নান করে সাদা জমিন লাল পাড়ের শাড়ী পরে ফুল তুলতো। একটি বেতপাতা, একটি জবাফুল বা অন্য কোন ফুল ও পাঁচপাতার আম সরা ঘরের প্রতিটি দরজায় লাগানো হত। মাটির ঘরের মেঝে ও ডোয়া-তে চাল বেটে গোলা করে বা চুন দিয়ে লতাপাতাসহ নানা ডিজাইনের আলপনা আঁকত। অবশ্য আজকাল প্রত্যন্ত গ্রাম ছাড়া এসব সচরাসচর চোখে পড়ে না।

ঘর সাজিয়ে রান্নাঘরের কাজে লেগে যেত নারীরা। প্রথমে হত সকালের জলখাবার বানানোর কাজ। লুচি, পায়েস, হালুয়া, চিড়া, মুড়ি, দই, খই, নারিকেল, গুড়, মিষ্টান্ন–একেক বাড়িতে একেক রকম জলখাবার বানানোর আয়োজন চলতো। সকালের জলখাবার গ্রহণ করার পরে বাড়ির গৃহিনীরা দুপুরের রান্নার আয়োজনে আবারও ব্যস্ত হয়ে পড়ত। কেউ বা শিলপাটার বাটনা বাটত, কেউ শাকসবজি-মাছ-মাংস কুটে রান্না করত। সাধারণত পহেলা বৈশাখে বেগুন ভাজি, আলু ভাজি, মিষ্টি কুমড়া ভাজি, মাছের ঝোল, বুটের ডাল, মাংস যার যার সামর্থ্য অনুযায়ী এসব রান্না করা হত বাড়িতে বাড়িতে। চৈত্র মাসে কাঁচা আম খাওয়া বারণ ছিল, বাড়ির বড়রা বলত আম জলে না দিয়ে খাওয়া যায় না; সে কারণে নববর্ষের দিনে অনেকেই তাদের ছেলেমেয়ের জন্য আম গুড় দিয়ে এক ধরনের সস রান্না করত, যাকে বলা হত ‘টক’। এরপর থেকে ছেলেমেয়ে কাঁচা আম খেতে পারত। আজকের দিনের মত তখন ইলিশ-পান্তা ও ভর্তা খেতে কাউকে দেখিনি। দোকান ব্যবসায়ীরা তাদের পুরনো বছরের দেনা-পাওনার হিসেব সমন্বয় করে নতুন খাতা খুলত যা হালখাতা নামে পরিচিত। পহেলা বৈশাখের দিনে ব্যবসায়ীরা খদ্দের ও আবালবৃদ্ধবনিতা সকলকেই মিষ্টিমুখ করাত। ব্যবসায়ী তাদের এ সংস্কৃতি এখনও ধরে রেখেছে।

বাংলা নববর্ষের অন্যতম আকর্ষণ বৈশাখী মেলা। বাড়ির বড়দের হাত ধরে শিশু-কিশোরেরা মেলায় যেত এবং তাদের আকর্ষণ ছিল মাটির কোঁদা বা মাটি ঢেলা তৈরি পুতুলের প্রতি। মাটির খেলনাগুলোর মাঝে অন্যতম আকর্ষণ ছিল ‘বুড়ো দাদু’; তুলোর তৈরি শাদা দাড়ি, হোক্কা হাতে, একটু নাড়া লাগলে স্প্রিংয়ের কারণে বুড়োর মুখ কাঁপতো। হাতি, ঘোড়া, বাঘ, হরিণ, শিশুকোলে মা, কলসি কাঁখে গ্রাম্যবধূ ইত্যাদি শিশুদের চাইই চাই। এ ধরনের মাটির তৈরি নানা ধরনের খেলনা কিনে নিয়ে তারা বাড়ি ফিরত। মেলায় তারা চড়ত নাগরদোলায়। এছাড়াও ফুট, তরমুজ, জিলাপি, আমিত্তি, বাতাসা, গুড়ের সন্দেশ, চিনির দিয়ে তৈরি হাতি-ঘোড়া-বাঘ-কুমির খেলনাখাবার কিনে বাড়িতে ফিরত। শিশুদের মাঝে চিনির তৈরি খেলনা জমানোর প্রতিযোগিতা হত, কার কাছে কয়টি আছে। কিশোর ও যুবকেরা কিনতো বাঁশের বাঁশি, তালপাতার বাঁশি, ঢোল।

সন্ধ্যা হলে বাড়ি ফেরার পরে চারপাশ নানা রকম বাদ্যযন্ত্রের শব্দে ভরে যেত, রাত্রি না গড়ানো পর্যন্ত সে সুর ভেসে আসত দূর থেকে। নারীরা কিনতো রঙ-বেরঙের কাঁচের চুড়ি, ফিতা, তালপাখা, আয়না, গয়না। পুরুষেরা কিনতো হুক্কা, পরিবারের জন্য বাসনকোসন, বাঁশের ও নারকেলের নানা তৈজসপত্র। তারা বৈশাখী মেলায় যেত পাঞ্জাবি, ফতুয়া, লুঙ্গি, ধুতি, পাজামা পরে; কারো কারো কাঁধে থাকত গামছা। তারা দেখতে যেত লাঠিখেলা, নৌকা বাইচ, বাউল গান। পুতুল নাচ ছিল সকলের প্রিয়। গৃহস্থ বাড়ির বউয়েরা লাল পাড়ের শাড়ি ও কপালে লাল টিপ পরে পহেলা বৈশাখের মেলায় যেত, কেউ কেউ এ বাড়ী থেকে ও বাড়ী-পাড়া-প্রতিবেশী-আত্নীয় স্বজনের বাড়ি ঘুরে ঘুরে শুভেচ্ছা ও কুশল বিনিময় করত। একে অপরের মঙ্গল কামনা করে মিষ্টিমুখ করিয়ে তারা আনন্দ পেত।

বাঙালির প্রাণের উৎসব পহেলা বৈশাখ বা বাংলা নববর্ষ উদযাপনে ধর্ম-বর্ণ নির্বিশেষে নারী-পুরুষের সম্মিলিত অংশগ্রহণ, মেলা, লোকজ গান, লোকজ খেলা, রকমারী দেশীয় খাবার একে অপরে ভাগ করে নিত—যা বাঙালীর সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতির অনন্য উদাহরণ।

Author

Share on facebook
Facebook
Share on whatsapp
WhatsApp
Share on twitter
Twitter
Share on linkedin
LinkedIn
আপনি এটাও পড়তে পারেন
শেয়ার বাজার

আপনি এই পৃষ্ঠার কন্টেন্ট কপি করতে পারবেন না।