ঢাকা শেয়ার বাজার

২৩ জুলাই ২০২৪ মঙ্গলবার ৮ শ্রাবণ ১৪৩১

স্বপ্নময় পথ ধরে: আরফিনা

সবার আগে শেয়ার বাজারের নির্ভর যোগ্য খবর পেতে আপনার ফেসবুক থেকে  “ঢাকা শেয়ার বাজার ডট কম” ফেসবুক পেজে লাইক করে রাখুন, সবার আগে আপনার ওয়ালে দেখতে। লাইক করতে লিংকে ক্লিক করুন  facebook.com/dhakasharebazar

বাংলাদেশের চট্টগ্রামের এক তরুণ আর পাঁচটি সাধারণ ছেলের মতই বড় হয়ে উঠছিল। তরুণরা মোট তিন ভাই, সে মেজ। পড়াশুনার প্রতি সে বরাবরই উদাসীন। গ্রামেগঞ্জের নদী-নালায় সে ঘুরে বেড়াত। নারকেল গাছ চড়তো আর পাখি ভালোবাসতো । ঘন বনানীর প্রতি তার একটা আলাদা টান ছিল ,প্রকৃতির রূপ রস গন্ধে সে মুগ্ধ হতো। গ্রামের সাদাসিধে এই ছেলেটি একটু-আধটু দুষ্টুমি করত আর তখনকার সময়ে যেন বীরের খেলায় মেতে থাকতো ।

তরুণের বাবা ছিলেন জাহাজের ক্যাপ্টেন। গ্রামের মধ্যেই তারা অন্যদের থেকে শিক্ষিত এবং সচ্ছল পরিবার। বিশাল বড় বাড়ি, চাকর বাকর আরো কত কি! সে এক এলাহি ব্যাপার । মোটকথা, ঐশ্বর্য আর বৃত্তের ঝলকানি। বড়দাদা ছিলেন ব্যবসায়ী, সেও বাবার মত সমাজে প্রতিষ্ঠিত কিন্তু তরুণ অন্য ধরনের মানুষ। সে আপন মনের গহন টানে এগিয়ে চলে। সে কোন কিছুতেই নিজেকে বাঁধতে চায় না।

তরুণের এই বহেমিয়ান মনের জন্য তাকে অনেক অপমান ও লাঞ্ছনার শিকার হতে হয় নিজের বাবার থেকে। ক্যাপ্টেন বাবার ছোট্ট একটি কথাই তার জীবনে অন্য ভাবনা বয়ে নিয়ে আসে। তার বাবা তাকে বলেছিল “পড়াশোনা করার মতো পড়াশোনা কর, নাহলে লোকের বাড়িতে কাজ করতে যা, কিছুই হবেনা তোর দ্বারা, তোর মতন একটি ছেলে থাকার চেয়ে না থাকাই ভাল।”

দিনের পর দিন তাকে এরকম কথা শুনতে হয়েছিল। যার চরম পরিণতি তাকে ঘর ছাড়তে বাধ্য করেছিল মাত্র বারো বছর বয়সে। ছোট তরুণ বাবার কথাতে মানসিক ভাবে ভেঙে পড়ে। সবচেয়ে বড় কথা তার মাও বাবার কথাতে সম্মতি দেয়।তাই অতি অল্প বয়সেও সে অনেকটা আবেগের বশবর্তী হয়ে কোন কিছু না ভেবেই বাড়ি ছাড়ার সিদ্ধান্ত নেয় ।

রাতের অন্ধকারে আইন ট্যাক্সে রাখা বাবার কিছু টাকা সম্বল করে সে একেবারে অপরিচিত জীবনে পা রাখে, ঢাকা শহরে আসে। একেবারে আনকোরা হলে যা হয়, তাই এর ধাক্কা ওর ধাক্কা আর তার সাথে গালমন্দ তার ভাগ্যে জোটে । ঢাকার আনাচে-কানাচে ঘুরে সে তেমন সুবিধে করতে না পেরে খুলনাতে চলে আসে । ততদিনে তার সঞ্চিত অর্থ একেবারে নিঃশেষ।

সে সপ্তাহ খানেক একজন লোকের বাড়ির বারান্দায় রাত কাটায়। তারা দুবেলা দুমুঠো খেতে দেয় বিনিময়ে তাদের সব রকমের কাজ, বাজার করা থেকে চণ্ডীপাঠ সব করতে হয় কিন্তু সে তো এমন জীবন চায়না। তাই সে অন্য স্বপ্নে বিভোর হয়ে দূরে কোথাও যেতে চায়। লোকমুখে সে ইন্ডিয়া আরব, লন্ডন প্রভৃতি জায়গার কথা শোনে। হঠাৎই একদিন এক লোকের সাথে পরিচয় হয়, সে নাকি ভারতে কাজ করে। আর এখান থেকেই বোধহয় তার ভারত যাত্রা শুরু হয়।

তরুণ এক ভদ্রলোকের সহায়তায় বর্ডার পেরিয়ে ভারতে চলে আসে। কাঁটাতারের বেড়া পেরিয়ে পিছনে ফেলে আসে তার অতীত। একটা দেশ পারাপার নতুন জীবন নতুন স্বপ্নের হানাহানি। একরাশ নিরাশাকে সে পিছনে ফেলে অনাগত সোনালী জীবনে এগিয়ে যেতে চায় ।

প্রথমে উত্তর ২৪ পরগনাতে সে ফলের ব্যবসায়ীদের সাথে ভিড়ে যায়। সেখানে সে ফল বিক্রি করে তাদের সাহায্য করে। তারা তাকে আধ পেট খেতে দেয়। সে খাবার অনেকটা কয়েদির স্বাদহীন খাবারের মতো। এখানে সে কলকাতার গল্প শোনে। কলকাতা শহর টানে তাই সে এই ফল বিক্রেতার জীবন থেকে ইতি টেনে শহরের রেলস্টেশনে আসে।

সেখানে সে একটি ভয়ঙ্কর অভিজ্ঞতার সাক্ষী হয়। তার ব্যাগের সমস্ত জিনিসপত্র ছিনতাই হয়। সেই মুহূর্তে তার প্রচন্ড খিদে পায়। পকেটে একটি পয়সাও নেই।  কলকাতা যাওয়া তো দূরের কথা পেটে দেওয়ার মতো কিছু নেই। সামনে ময়দা মাখাচ্ছে ময়রা। গরম গরম লুচি পরোটা হচ্ছে। তা দেখে তরুণের খিদে দ্বিগুণ হয়, কিন্তু উপায় নেই। সে ভদ্রলোকের ছেলে সাহস করে চাইতেও পারে না ‘ও দাদা একটু পরোটা খেতে দেবে খুব খিদে পেয়েছে’ বলতে তার সংস্কারে বাধে। তাই সে শুকিয়ে থাকে।

স্টেশনে সে যাকে পায় তার সাথে আলাপ জমাতে চেষ্টা করে।  সবাইকে তার বন্ধু বলে মনে হয়। সে তার সমস্যার কথা তুলে ধরে বলে- আমার শিয়ালদহ স্টেশন যাওয়ার একটি টিকিট কেটে দেবে ? এটুকুই সে প্রত্যাশা করেছিল। সে তো আর কোনো টাকা-পয়সা চায়নি। তবুও কেউ তাকে সাহায্য করেনি বরং একজন তাকে বিনা টিকিটে ভ্রমণ করার কথা বলে । কোনো বিকল্প পথ না পেয়েই তরুণ তাই করে।

শিয়ালদহে সে বেশ কয়েক রাত স্টেশনে কাটায়। রুটি রুজির জন্য দিনের বেলায় বিভিন্ন কাজ করে রাত্রিতে ফুটপাতে ঘুমায়। এখানে দীর্ঘ কয়েক মাস থাকার পরে সে শহরের থেকে দূরের মফঃস্বল বারুইপুরের কথা শোনে। লোকমুখে সে জানতে পারে সেখানে থাকা খাওয়ার খরচ সস্তা শহর থেকে। সে আরো ভালো করে বারুইপুরের খোঁজ লাগাতে থাকে।

শূন্য মহাকাশ শূন্য নয়, কোটি কোটি গ্রহ নক্ষত্রে পরিপূর্ণ। যে জায়গা তাকে সুদূর চট্টগ্রাম থেকে কোথাও একটি অমোঘ টানে এখানে নিয়ে এসেছে  তাই সব অমানবিক কষ্ট সহ্য করেও সে পিছনে না তাকিয়ে ,এগিয়ে চলার আপ্রাণ চেষ্টা করে ।

বারুইপুর পৌঁছে সে এদিক ওদিক ঘুরতে থাকে। বেশ কয়েকদিন সে হরিসভা জলসার মতো ধর্মীয় অনুষ্ঠানে রাত কাটানোর পর আর একটু পাত পাওয়ার জন্য চেষ্টা করতে থাকে। দিনের বেলা সে টো টো কোম্পানির মত চারিদিকে ঘুরতে থাকে। এইভাবে বেশ কিছু দিন চলে। এইবার কিছু একটি করতে হবে তো ভাত খেতে গেলে হোটেলে দু টাকা করে লাগে তার জোগাড় করতে হবে তো। রাতে বা সে সবসময় কোথায় থাকবে তার ব্যবস্থা বা কি হবে?

তরুণ বুদ্ধিমান ছেলে সে বুদ্ধি করে হোটেলের মালিক জামশেদজির সাথে ভাব জমায় এবং তাকে বলে আমি এখানে সবসময় খাওয়া দাওয়া করব এত বড় হোটেল রাত্রিতে আমার একটু ঠাঁই দিতে হবে। কিন্তু জামশেদজি রাজি হয় না। পাশে এক ভদ্রলোক তরুণকে ডাকে, বলে, “শোন এখানে আয় খোকা”। তরুণ ভদ্রলোককে তার জীবনের সব বৃত্তান্ত জানায়। ভদ্রলোক দেখলেন ছেলেটির মধ্যে অসীম জেদ আর আত্মসম্মানবোধ আছে । ভদ্রলোক জামশেদজিকে বললেন ‘আমি দায়িত্ব নিচ্ছি যদি কিছু ক্ষতি হয় তার সমস্ত দায়ভার আমার, তাকে রাত্রিতে একটু আশ্রয় দিন।’

ভদ্রলোক চলে যাওয়ার সময় তরুণ কে বলেন

‘আমায় তুই অচেনা কাকু বলে ডাকিস কেমন?’

তরুণ রাতে হোটেলে থাকে এবং দিনে ট্রেনে ট্রেনে গান গায়। এই সময় তার বাবার কথা মনে পড়ে। ভাবে সত্যিই পড়াশোনা শিখলে কিছু করে খেতে পারতো। নিজের নাম পর্যন্ত ভালোভাবে লিখতে পারে না সে। তরুণ জেদ ধরে সে তার অতীতকে মনে করবে না কিছুতেই। তরুণ গান গেয়ে যতটুকু টাকা জমে, কিছু টাকা নিজের প্রয়োজনের তাগিদে খরচ করে এবং বাকি টাকা সে তার অচেনা কাকুকে দেয় কিন্তু ভদ্রলোক তা না নিয়ে তরুণকে তার বাড়িতে নিয়ে যান…..

স্বপ্নময় পথ ধরে: আরফিনা

অবনী হঠাৎ বিছানা থেকে ধড়পড় করে উঠে পড়লো। গতকাল রাতে সে কিছু না খেয়ে ঘুমিয়ে পড়েছিল। সারারাত ধরে সে যে স্বপ্ন দেখলো, সেই স্বপ্নের সঙ্গে তার জীবনের কোন মিলই তো নেই! সে তো চাকরি করে।

হঠাৎ দরজা খুলে অবনীর ঠাকুমা ঘরের মধ্যে প্রবেশ করলেন।

কিরে ! অবনী এখনো উঠিসনি ! আজ আফিস যাবিনা বুঝি!

— না ঠাকুমা আজ একটু কলেজ স্ট্রিটে যাব। কিছু বই কেনার আছে যে। এসব বাদ দাও। জানো ঠাকুমা, আজ আমি একটি অদ্ভুত স্বপ্ন দেখলাম ।এই স্বপ্নের যে মাথা মুন্ডুই খুঁজে পেলাম না।

—কি স্বপ্ন রে বাবু !

অবনী বিছানা থেকে উঠে টেবিলে রাখা কলমদানিতে হাত দিয়ে কি যেন খুঁজছিল, তারপর টেবিলের বই গোছাতে গোছাতে সংক্ষেপে তার স্বপ্নের বিবরণ দিল।

অবনী ঠাকুমার দিকে তাকায়।

— একি ঠাকুমা কাঁদছো কেন?

—কাঁদছিনা রে! খুব মনে পড়ছে তার কথা।

—কার কথা?

—তোর দাদুর কথা। জানিস তোর এই স্বপ্ন আর কারো নয়। তোর দাদুর জীবনে ঘটেছে। তোর দাদু একমাত্র আমাকেই বলেছিল। জীবনের গুরুত্বপূর্ণ ঘটনাটি আর কাউকে বলবে সে সুযোগই হয়নি।

অবনী অবাক হয়ে যায়।

—এটি কি করে সম্ভব ঠাকুমা?

—এটি সম্ভব নয় কেন অবনী! দাদু তোকে খুব ভালোবাসত, তাই তোকে তার জীবনের সত্য ঘটনাটি জানিয়ে দিল। তুই কি মনে করিস মানুষ যখন মারা যায় তখন কি সে পর হয়ে যায়? চোখে না দেখলে কি মানুষ দূরে সরে যায়! আসলে মানুষ চোখের দেখায় অভ্যস্ত তাই এমনটি মনে করে। যখন আমাদের চোখের দেখা শেষ হয়ে যায়, তখন মনের দেখাতে মানুষটিকে নতুন ভাবে নতুন রূপে আমরা দেখতে পাই। তোর দাদু তোর কাছেই আছে অবনী। তোকে বলে গেল স্বপ্নটির মাধ্যমে “অবনী শত আঘাতে বারে বারে ছিন্ন হতে পারো, কিন্তু আশা ছাড়বে না এগিয়ে যাবে…”

Share on facebook
Facebook
Share on whatsapp
WhatsApp
Share on twitter
Twitter
Share on linkedin
LinkedIn
আপনি এটাও পড়তে পারেন

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

শেয়ার বাজার
error: বিষয়বস্তু সুরক্ষিত !!