রাত আনুমানিক সাড়ে দশটা, চারদিক প্রায় নিস্তব্ধ। এ সময় একদল বিপ্লবী আক্রমণ করল ব্রিটিশ পুলিশের অস্ত্রাগার।তাদের আকস্মিক আক্রমণে সেখানে থাকা পুলিশ বাহিনী পালিয়ে গেল। পুরো পুলিশ লাইন তাদের দখলে। ব্রিটিশ অক্সিলারি ফোর্সের অস্ত্রাগারও তারা দখলে নিল।
এই ঘটনার পর শহরের বিভিন্ন স্থানে থাকা নানা পেশায় নিযুক্ত ব্রিটিশরা পরিবার পরিজনসহ আশ্রয় নিল সমুদ্রে ভেসে থাকা একটি জাহাজে।
এ ঘটনা ব্রিটিশ শাসনামলে বর্তমান বাংলাদেশের চট্টগ্রামে, ১৮ এপ্রিল ১৯৩০ সালে। যারা এই দুঃসাহসিক কাজটি করেছিল তারা সবাই ছিল বাঙালি বিপ্লবী। উদ্দেশ্য ছিল ব্রিটিশদের হটিয়ে চট্টগ্রামের দখল নেয়া।
সেদিন তারা পুলিশ লাইন দখল করে পতাকা দন্ড থেকে ব্রিটিশ পতাকা ইউনিয়ন জ্যাক নামিয়ে, তাঁরা উড়িয়েছিলেন ভারত প্রজাতন্ত্রের পতাকা। ব্রিটিশদের হটিয়ে যারা চট্টগ্রামে ভারত প্রজাতন্ত্রের পতাকা উড়িয়েছিলেন, তাদের নেতৃত্বে ছিলেন সূর্যসেন নামে একজন তরুণ। সকলে তাঁকে মাস্টারদা বলে ডাকতেন।
সেদিন জয়ের আনন্দে তরুণ বিপ্লবীরা মধ্যরাতে আকাশ লক্ষ্য করে তিনবার একসঙ্গে গুলি ছুড়ে বিজয় ঘোষণা করেন। আর সঙ্গে সঙ্গে স্লোগান দিতে থাকেন ‘বন্দে মাতরম’ ‘ইনকিলাব জিন্দাবাদ’ ‘মাস্টারদা জিন্দাবাদ।’ তাদের এই দুঃসাহসিকতায় চট্টগ্রাম ব্রিটিশদের শাসন থেকে কয়েকদিন মুক্ত ছিল।
১৯৩০ সালের ২২ এপ্রিল অস্থায়ী গণতান্ত্রিক বিপ্লবী সরকারের শেষ ঘাঁটি জালালাবাদ পাহাড় ঘিরে ফেলে ব্রিটিশ সেনা আর তাদের এ-দেশীয় সৈন্যরা। দুই পক্ষের মধ্যে তুমুল যুদ্ধ হয়, যুদ্ধে উভয় পক্ষেরই অনেক হতাহত হন। সন্ধ্যা হতেই শত্রু পক্ষের মেশিনগান থেমে যায়। ব্রিটিশ বাহিনীর সেনারা ট্রেনে শহরে ফিরে যায়।
বিপ্লবীরা দুই দলে ভাগ হয়ে পাহাড় থেকে নেমে গ্রামে আত্ম গোপন করার উদ্দেশ্যে অন্ধকারে মিলিয়ে গেল। চট্টগ্রাম যুব বিদ্রোহের ১৮ এপ্রিলের অভ্যুত্থান ও জালালাবাদ পাহাড়ের যুদ্ধের (২২ এপ্রিল) পরবর্তী সময়ের গেরিলা যুদ্ধের সামগ্রিক বলিষ্ঠ ঐতিহাসিক ঘটনাবলীর আদর্শ দৃষ্টান্ত সৃষ্টি করা সম্ভব হয়েছিল, সূর্যসেনের নেতৃত্বের বিশেষ বৈশিষ্ট্য ছিল বলে।
১৯৩৩ সালের ফেব্রুয়ারি মাসে চট্টগ্রামের পটিয়া থানার গৈরলা গ্রামের বিশ্বাসবাড়ির খিরোদাপ্রভা বিশ্বাসের বাড়িতে আশ্রয় নেয় সূর্যসেন, সাথী ছিল কল্পনা দত্ত, শান্তি চক্রবর্তী, মনি দত্ত ও সুশীল দাশগুপ্ত। জুলাই মাসে ব্রিটিশ সরকার সূর্য সেনকে ধরিয়ে দেওয়ার জন্য ১০ হাজার টাকা পুরস্কার ঘোষণা করে। ব্রিটিশ সরকার ঘোষিত টাকার লোভে নেত্র সেন নামে একজন সূর্য সেন এর অবস্থানের কথা পুলিশকে জানিয়ে দেয়।
ক্যাপ্টেন ওয়ামসলির নেতৃত্বে ব্রিটিশ গুর্খা সেনা ও পুলিশ খিরোদা প্রভার বাড়ি ঘেরাও করে। ব্রিটিশ সেনার ঘেরাও ভেদ করে গুলি করতে করতে বেরিয়ে যাওয়ার সময় ধরা পড়েন সূর্যসেন এবং নেত্র সেনের বড় ভাই ব্রোজেন সেন। বাকিরা গুলি চালাতে চালাতে পালিয়ে যেতে সক্ষম হন।
১৯৩৩ সালের মে-মাসের শেষ দিকে সূর্যসেন, তারকেশ্বর দোস্তীদার ও কল্পনা দত্তের বিচারের জন্য ভারতীয় পেনাল কোডের ১২১/১২১-এ ধারা অনুযায়ী স্পেশাল ট্রাইবুনাল গঠন করা হয়। মামলার আনুষ্ঠানিক কার্যক্রম শুরু হয় ১৫ জুন। ট্রাইবুনালের কমিশনাররা ছিলেন, বাকেরগঞ্জের(বরিশাল) দায়রা জজ ম্যাকসার্পি,সিলেটের অতিরিক্ত দায়রা জজ রজনী ঘোষ ও চট্টগ্রামের দায়রা জজ খন্দকার আলী তোয়েব।
আগ্নেয়অস্র বহন করা ছাড়া সূর্যসেনের বিরুদ্ধে সুনিদৃষ্ট কোনো অভিযোগের প্রমাণ উপস্থাপন করা যায়নি। ১৪ আগস্ট এই মামলার রায় ঘোষণা করা হয়। ট্রাইবুনাল সূর্যসেনকে ১২১ ধারা অনুসারে দোষী সাব্যস্ত করিয়া প্রানদণ্ডে দণ্ডিত করেন। ওই একই ধারায় তারকেশ্বর দোস্তীদারকেও প্রানদণ্ডে দণ্ডিত করা হয়। কল্পনা দত্তকে দন্ডবিধির ১২১ ধারা অনুসারে দোষী সাব্যস্ত করে যাবজ্জীবন দণ্ডাদেশ প্রদান করা হয়।
১৯৩৪ সালের ১২ জানুয়ারি ভোর রাতে সূর্যসেন ও তারকেশ্বর দোস্তীদারের ফাঁসি কার্যকর করা হয়। ফাঁসির পর লাশ দুটি জেলখানা থেকে ট্রাকে করে চার নম্বর স্টিমার ঘাটে নিয়ে যাওয়া হয়।
তারপর মৃতদেহ দুটোকে একটি ব্রিটিশ ক্রুজারে তুলে নিয়ে, বুকে লোহার টুকরা বেঁধে বঙ্গোপসাগর আর ভারত মহাসাগর সংলগ্ন একটা জায়গায় ডুবিয়ে দেওয়া হয়।
মৃত সূর্যসেনকে নিয়েও ছিল ব্রিটিশদের ভয় তাই তারা তাঁর মৃত্যু দেহ গভীর সমুদ্রে ডুবিয়ে দিয়েছিল। কিন্তু সূর্যসেনের বীরত্বগাথা তাঁর দেশপ্রেম, স্বাধীনতার চেতনা মুছে দেওয়া যায়নি মানুষের মন থেকে।
সূর্যসেনদের চট্টগ্রাম দখলের ১৭ বছরের মধ্যেই অর্থাৎ ১৯৪৭ সালের আগস্টে ব্রিটিশরা ভারত ছাড়তে বাধ্য হয়।
১৮৯৪ সালের ২২ মার্চ রাজমনি সেন ও শশীবালা দম্পতির একটি ছেলে হয়। চট্টগ্রামের রাউজান থানার নোয়াপাড়া গ্রামে থাকতেন তাঁরা। রাজমনি-শশীবালা ছেলের নাম রাখেন সূর্য কুমার। পরবর্তী সময়ে এই সূর্যকুমারই খ্যাতি লাভ করেন মাস্টারদা সূর্যসেন হিসেবে।
সূর্যকুমারের বয়স যখন পাঁচ বছর তখন তার বাবা রাজমনি সেন মারা যান। রাজমনি সেন মারা গেলে তাঁর ভাই গৌরমনি সেন ভাইয়ের ছেলেমেয়েদের দেখাশোনার দায়িত্ব নেন। বাবা মারা যাওয়ার তিন বছর পর আট বছর বয়সের সূর্য কুমারকে ভর্তি করা হয় গ্রামের দয়াময়ী প্রাইমারি স্কুলে। দয়াময়ী স্কুলের পাঠ শেষ হলে সূর্যকুমার চট্টগ্রাম শহরের নন্দনকাননের হরিশচন্দ্র দত্তের ন্যাশনাল স্কুলে ভর্তি হন।
১৯১৩ সালে প্রথম বিভাগে মেট্রিক পাস করে, চট্টগ্রাম কলেজে এফএ ক্লাসে ভর্তি হন। এফএ ক্লাসেও প্রথম বিভাগ পেয়ে পাস করেন। সূর্যসেন ১৯১৮ সালে বহরমপুর কৃষ্ণনাথ কলেজ থেকে বিএ পাস করেন। চট্টগ্রামে ফিরে তিনি ভ্রাম্য সমাজের প্রধান আচার্য হরিশ দত্তের ন্যাশনাল স্কুলে শিক্ষকতা শুরু করেন। অসহযোগ আন্দোলনের সময় বিদ্যালয়টি বন্ধ হয়ে গেলে তিনি দেওয়ান বাজারের অন্নদা চৌধুরী প্রতিষ্ঠিত উমাতারা উচ্চ ইংরেজি বিদ্যালয়ে অংকের শিক্ষক হিসেবে যোগ দেন। শিক্ষকতার কারণে তিনি সবার কাছে ‘মাস্টারদা’ হিসেবে পরিচিতি লাভ করেন।