আয় থেকে ব্যয় বাদ দিয়ে যে মুনাফা থাকে তাকেই বলা হয় পরিচালন মুনাফা, যা কোনো ব্যাংকের প্রকৃত মুনাফা নয়। এ মুনাফা থেকে খেলাপি ঋণ ও অন্যান্য সম্পদের বিপরীতে প্রভিশন (নিরাপত্তা সঞ্চিতি) সংরক্ষণ এবং সরকারকে কর পরিশোধ করতে হয়। প্রভিশন ও কর–পরবর্তী এ মুনাফাকেই বলা হয় ব্যাংকের প্রকৃত বা নিট মুনাফা।
ব্যাংকগুলোর আয়ের বড় একটি অংশ আসে আমদানি ও রপ্তানির কমিশন থেকে। গত বছর আমদানি কমেছে উল্লেখযোগ্য পরিমাণ। মন্থর ছিল রফতানি ও রেমিট্যান্সের প্রবৃদ্ধিও। আবার খেলাপি ঋণ বেড়েছে প্রায় সব ব্যাংকের। কিস্তি পরিশোধ অনিয়মিত হয়ে পড়ায় বাড়ছে মেয়াদোত্তীর্ণ ঋণ। তারল্য সংকট, মূলধন ঘাটতি, সঞ্চিতি (প্রভিশন) ঘাটতিসহ বেশির ভাগ ব্যাংকের আর্থিক ভিতও নাজুক হয়ে উঠেছে। এর পরও দেখা যাচ্ছে ২০২৩ সাল শেষে ব্যাংকগুলোর পরিচালন মুনাফা বেড়েছে।
গত বছরের (২০২৩) লাভ–ক্ষতির হিসাব গতকাল চূড়ান্ত করেছে দেশের বেশির ভাগ ব্যাংক। প্রাপ্ত তথ্য থেকে জানা যায়, বিদায়ী বছরে ইসলামী ব্যাংক বাংলাদেশ পিএলসি ২,৭৮১ কোটি টাকা পরিচালন মুনাফা পেয়েছে। তার আগের বছর ব্যাংকটির এ মুনাফা ছিল ২,৬৪৬ কোটি টাকা। গত বছর রেকর্ড ১,৭৫৬ কোটি টাকা পরিচালন মুনাফা করেছে পূবালী ব্যাংক পিএলসি। ২০২২ সালে যা ছিল ১,১১৩ কোটি টাকা। বেসরকারি এ দুটি ব্যাংকের মতো দেশের প্রায় সব ব্যাংকেরই পরিচালন মুনাফায় প্রবৃদ্ধির তথ্য পাওয়া গেছে।
এমনকি চতুর্থ প্রজন্মের ব্যাংকগুলোরও মুনাফা বেড়েছে। যেমন ২০২২ সালে ইউনিয়ন ব্যাংকের পরিচালন মুনাফা ছিল ৪১৫ কোটি টাকা। শরিয়াহ্ভিত্তিক এ ব্যাংকটি বিদায়ী বছর ৪৫৫ কোটি টাকার পরিচালন মুনাফা পেয়েছে। মেঘনা ব্যাংকের পরিচালন মুনাফা আগের বছরের ৭৫ কোটি টাকা থেকে বেড়ে ১৬৫ কোটিতে উন্নীত হয়েছে ২০২৩ সালে।
রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাংকগুলোর মধ্যে ২০২৩ সালে পরিচালন মুনাফায় বড় প্রবৃদ্ধি দেখিয়েছে রূপালী ব্যাংক লিমিটেড । ২০২২ সালে রূপালী ব্যাংকের পরিচালন মুনাফা ছিল ১০৬ কোটি টাকা। ২০২৩ এ মুনাফা বেড়ে ৬৯৬ কোটি টাকায় উন্নীত হয়েছে বলে জানিয়েছেন সংশ্লিষ্টরা।
এ বিষয়ে রূপালী ব্যাংকের ব্যবস্থাপনা পরিচালক মোহাম্মদ জাহাঙ্গীর বলেন, ‘রূপালী ব্যাংকের সুদ খাত দীর্ঘদিন থেকে লোকসানি ছিল। ২০২৩ সালে তা ইতিবাচক ধারায় ফিরেছে। এর প্রভাবে ব্যাংকের পরিচালন মুনাফায় বড় প্রবৃদ্ধি হয়েছে। বছরটিতে আমরা ৫১৮ কোটি টাকার খেলাপি ঋণ আদায় করতে পেরেছি। এটি বড় সাফল্য।’
পরিচালন মুনাফায় প্রবৃদ্ধি হয়েছে রাষ্ট্রায়ত্ত জনতা ব্যাংকেরও। গেল বছর ব্যাংকটির পরিচালন মুনাফা হয়েছে ১,০২৩ কোটি টাকা। এর আগের বছর ৯২৮ কোটি টাকাপেয়েছিল।
ব্যাংকগুলোর পরিচালন মুনাফা বাড়ার বিষয়ে বিভিন্ন অর্থনীতিবিদরা বলছেন, ব্যাংকগুলোর পরিচালন মুনাফার প্রবৃদ্ধির তথ্য দেশের সামষ্টিক অর্থনৈতিক পরিস্থিতির সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ নয়। সারা বছর ব্যাংকগুলো সংকটের কথা বলেছে। বিদায়ী বছরের শেষ প্রান্তে এসে ব্যাংক খাতের সংকট আরো গভীর হয়েছে। এর মধ্যে পরিচালন মুনাফা বেড়ে যাওয়াটি রহস্যজনক। মূলত ব্যাংক নির্বাহীরা বেশি মুনাফা দেখিয়ে মালিক পক্ষকে সন্তুষ্ট করতে চেয়েছে। ঋণ পুনঃতফসিল করে ব্যাংকগুলো অনাদায়ী সুদকেও আয়ের খাতে দেখিয়েছে। এর প্রভাবেই বেড়েছে তাদের পরিচালন মুনাফা।
সঠিকভাবে হিসাব–নিকাশ করলে পরিচালন মুনাফার কতটা টিকবে, সেটি নিয়ে যথেষ্ট সন্দেহ রয়েছে। ব্যাংক এখন নিজের ইচ্ছা অনুযায়ী যখন–তখন খেলাপি ঋণ পুনঃতফসিল করতে পারছে। এর মাধ্যমে দুর্দশাগ্রস্ত ঋণ বাড়লেও কাগুজে মুনাফা দেখানো যাচ্ছে। সঞ্চিতি সংরক্ষণ ও কর পরিশোধের পর অনেক ব্যাংকেরই নিট মুনাফা কমে যেতে পারে।