ফ্রিল্যান্সিং (Freelancing) একটি ইংরেজী শব্দ । এর বাংলা অর্থ হলো মুক্ত পেশা । কোননির্দিষ্ট সময় ছাড়া, নির্দিষ্ট বেতন ছাড়া, কোম্পানির বা মালিকের কোন কাজ অনলাইনে সম্পুর্ন করে টাকা আয় করাকে ফ্রিল্যান্সিং বলে।
উদাহরণস্বরূপ বলা যায়, আমরা যদি কোন কোম্পানিতে চাকুরী করতে চাই তাহলে সেখানে প্রথমে চাকুরীর জন্য আবেদন করতে হয় । তারপর অ্যাপ্রুভ হলে আমরা সেখানে একটি নির্দিষ্ট সময়ে নির্দিষ্ট বেতনে কোম্পানির মালিকের হয়ে কাজ করি । কিন্তু ফ্রিল্যান্সিং হচ্ছে, আমরা কোন কোম্পানির কাজ করব তবে তা মুক্তভাবে, সেখানে কোনো নিদিষ্ট সময় থাকবে না, আমরা আমাদের সময় সুযোগ বুঝে কাজ করব | আর কোনো বেতন নির্দিষ্ট থাকবে না | আমরা যত সময় দিতে পারবো তত টাকা ইনকাম করতে পারব | এখানে কারো অধীনে থেকে বাধ্যতামূলক কাজ করতে হবে না |
আরও সহজ ভাষাতে ফ্রিল্যান্সিং হলো মুক্ত পেশা। অর্থাৎ, যে পেশায় কাজ করতে কারোকোন হস্তক্ষেপ বা বাঁধা নেই। সমাজ জীবনে আমরা যেভাবে একে অপরের সাথে চুক্তিবদ্ধ হইএবং পরস্পরের মাঝে কাজের পারিশ্রমিক আদান–প্রদান করি, ঠিক একই ভাবে ইন্টারনেটব্যবহার করে যে কাজ করা হয় এবং সে কাজের পারিশ্রমিক স্বরূপ যে অর্থ উপার্জন হয় তাকেই ফ্রিল্যান্সিং বলে।
ইদানীং বাংলাদেশের লাখ লাখ মানুষ ফ্রিল্যান্সিং (Freelancing) করে টাকা রোজগার করছেন।ফ্রিল্যান্সিং (Freelancing) কাজগুলি যেহেতু বিদেশি ,অনেকেই এর ফ্রিল্যান্সিং (Freelancing) থেকে আয় করা বিষয় টি নিয়ে হারাম না হালাল জানতে আগ্রহ প্রকাশ করেন।
এ জগতে হাজার হাজার কাজ আছে। সেগুলো থেকে যদি কেউ কিছু শর্ত সাপেক্ষে হালালকর্মের মাধ্যমে অর্থ উপার্জন করে তাহলে নি:সন্দেহে তা হালাল।
রাসূল ﷺ ইরশাদ করেন
مَا أكَلَ أَحَدٌ طَعَاماً قَطُّ خَيْراً مِنْ أنْ يَأكُلَ مِنْ عَمَلِ يَدِه، وَإنَّ نَبيَّ الله دَاوُدَ عليه السلام كَانَيَأكُلُ مِنْ عَمَلِ يَدِهِ
‘নিজের হাতের উপার্জন থেকে উত্তম খাবার কেউ কখনো খায় নি। আল্লাহর নবী দাউদআলাইহিস সালাম নিজ হাতের উপার্জন থেকে খেতেন।’ [সহীহুল বুখারী ২০৭২]
তবে এক্ষেত্রে সর্বদা হালাল–হারামের বিষয়টি মাথায় রাখতে হবে এবং হারাম ও সন্দেহপূর্ণবিষয় থেকে দূরে থাতে হবে। কারণ রাসূল ﷺ ইরশাদ করেন,
«إنَّ الحَلاَلَ بَيِّنٌ، وَإنَّ الحَرامَ بَيِّنٌ، وَبَيْنَهُمَا مُشْتَبَهَاتٌ لاَ يَعْلَمُهُنَّ كَثيرٌ مِنَ النَّاسِ، فَمَنِ اتَّقَىالشُّبُهَاتِ، اسْتَبْرَأَ لِدِينهِ وَعِرْضِهِ، وَمَنْ وَقَعَ فِي الشُّبُهَاتِ وَقَعَ في الحَرَامِ»
‘অবশ্যই হালাল স্পষ্ট এবং হারামও স্পষ্ট। আর এ দুটির মাঝখানে রয়েছে কিছু সন্দেহপূর্ণবস্তু; যা অনেক লোকেই জানে না। অতএব যে ব্যক্তি এই সন্দেহপূর্ণ বিষয় সমূহ হতে দূরেথাকবে, সে তার দ্বীন ও মর্যাদা রক্ষা করবে এবং যে সন্দেহপূর্ণ বিষয়ে পতিত হবে সে হারামেপতিত হবে।’[সহীহুল বুখারী ৫২]
ইসলামী শরীয়ত মতে, সেবার বিনিময়ে মজুরি পাওয়াকে ইজারাহ বলে। ফ্রিল্যান্সিং হলইজারাহ চুক্তিরই একটি রূপরেখা। যেখানে ফ্রিল্যান্সারের অবস্থান একটি যৌথ শ্রমিকেরমতো এবং গ্রাহকের অবস্থান ভাড়াটের মতো। আর তাদের মধ্যে যেহুতু ইজারাহ চুক্তি হয়, তাই তাদের মধ্যকার চুক্তিতে ইজারার যাবতীয় শর্ত থাকা আবশ্যক। তাই ফ্রিল্যান্সিংয়েরমাধ্যমে যে পরিষেবা প্রদান করা হয়, যদি সেগুলিতে অবৈধ কোনো সামগ্রী না থাকে(যেমন:কোনো হারাম জিনিষের প্রচার, বিজ্ঞাপন, সঙ্গীত, ইত্যাদি না থাকে) তাহলে সেগুলিরবিনিময়ে অর্থ গ্রহণ করা জায়েজ। আর অবৈধ কোনো সামগ্রী থাকলে তা বৈধ হবে না।যেমন কোনো প্রাণীর ছবি বা অশ্লীল বিজ্ঞাপন ইত্যাদি।
বিন্নুরি টাউনের ওয়েবসাইটে রয়েছে
‘ফ্রিল্যান্সিংয়ের মাধ্যমে গ্রাফিক্স ডিজাইন বা ওয়েবসাইট তৈরি করে বিক্রি করা এবং তা দ্বারাঅর্থ উপার্জন করা শরী‘আতে জায়েয, তবে শর্ত হল এতে প্রাণীর ছবি এবং বিজ্ঞাপন ওসঙ্গীত ইত্যাদি অবৈধ কোনো সামগ্রী না থাকা।
দারুল উলুম দেওবন্দের ওয়েবসাইটে রয়েছে
‘ফ্রিল্যান্সিং ওয়েবসাইটে অমুসলিমদের কাজ করে তাদের থেকে মজুরি গ্রহণ জায়েয হবেকি?
জবাবে বলা হয়, একজন ফ্রিল্যান্সারের জন্য একটি ফ্রিল্যান্সিং ওয়েবসাইটে একজনক্লায়েন্টের কাছ থেকে যেকোনো বৈধ কাজ নেওয়া এবং এর জন্য একটি নির্দিষ্ট ফি নেওয়াবৈধ।
আর যদি ক্লায়েন্ট (গ্রাহক) অমুসলিম হয়,তাহলে যেহুতু মুসলিম আইনবিদদের নির্ভরযোগ্যমতানুসারে অমুসলিমগন শরীয়তের শাখাগত বিধানাবলী পালনে আদিষ্ট না। এ জন্য, চুরি, আত্মসাৎ ও প্রতারণা ব্যতীত সুদ ইত্যাদির যা কিছু টাকা তাদের কাছে থাকে তা হারাম নয়; তাই কোনো মুসলমানের জন্য অমুসলিম ব্যক্তির কাছ থেকে কোনো বৈধ কাজের মুজুরি বাউপহার হিসেবে ওই টাকা নেওয়া অবৈধ নয়।
[ফাতাওয়ায়ে রাশিদিয়া ৩২৭, ফাতাওয়ায়ে দারুল উলুম দেওবন্দ ১৭/৩৬৬ মাকতাবা দারুলউলুম দেওবন্দ]
আর ক্লায়েন্ট (গ্রাহক) যদি মুসলিম হয়, তাহলে বর্তমান সময়ে এক্ষেত্রেও ‘লেনদেনেরঅধ্যায়ে’ নির্ভরযোগ্য মতানুসারে তার টাকা সম্পর্কে যাচাই, অনুসন্ধান এবং গবেষণা করারপ্রয়োজন নেই। চুপচাপ সেই মুজুরীতে যে টাকা দেন, তা গ্রহণ করার সুযোগ আছে। [ফতোয়ানম্বর 600214]
আল্লাহ আমাদের হালাল ভাবে রোজগার করার তৌফিক দিন।আমিন।
লিখেছেন
হাফেজ–মাওলানা মোহাম্মদ ফয়সাল আরাবি।