ফিফার তদন্তে উঠে আসা বাফুফের যাবতীয় অনিয়ম এবং তার পরিণতিতে বাফুফের সাধারণ সম্পাদক আবু নাঈম সোহাগের দুই বছরের জন্য সব ধরনের ফুটবলীয় কার্যক্রম থেকে নিষিদ্ধ হওয়ায় বাফুফে সভাপতি হিসেবে সালাউদ্দিনের শুধু দায় স্বীকারকে অত সরল দৃষ্টিতে দেখার সুযোগ নেই।
ফিফার বিচারিক চেম্বারের রায়ে যদিও সালাউদ্দিনের বিরুদ্ধে কোনো অভিযোগ তোলা হয়নি, তবু এটা তো বলাই যায় যে, বাফুফে সভাপতি হিসেবে তিনি তাঁর দায়িত্ব পালনে ব্যর্থ।
বলা হচ্ছে, এ ঘটনার জন্য দায়ী সাধারণ সম্পাদকসহ বাফুফের সেসব কর্মকর্তার ‘আলসেমি’ ও ‘উদাসীনতা’, যাঁরা ফিফার কাছে যথাযথভাবে নিজেদের সপক্ষে তথ্যপ্রমাণ হাজির করতে পারেননি। যাঁদের হাত দিয়ে বাফুফের আর্থিক লেনদেন হয়, হিসাব–নিকাশগুলো যাঁরা দেখেন, তাঁদের অপেশাদারির মাশুল গুনতে হচ্ছে এখন।
কিন্তু ফিফার রায় বলছে, এই ঘটনা চলে আসছে সেই ২০১৬–১৭ সাল থেকে। বাফুফেকে সতর্কও করা হয়েছে একাধিকবার। নেওয়া হয়েছে ব্যবস্থাও। প্রশ্নটা তাই ওঠেই—এত বছরেও কথিত অনিয়মগুলোর কেন তিনি দৃষ্টি দেননি? এত বছরেও কি তিনি বুঝতে পারেননি, তাঁর অধস্তনরা সব লেজেগোবরে করে রাখছেন? তিনি কেন এসব সমস্যা দূর করার উদ্যোগ নেননি? নাকি সব জেনেও দৃষ্টিটা অন্যদিকে ঘুরিয়ে রেখেছিলেন কোনো এক অজানা কারণে!
সূত্র জানিয়েছে, কাল বাফুফে ভবনে কাজী সালাউদ্দিনের ‘কাঠগড়ায়’ তলব করা হয়েছিল বাফুফের দাপ্তরিক কাজের সঙ্গে যুক্ত নির্বাহীদের। বাফুফে সভাপতি তাঁদের বলেছেন, ফিফার ৫১ পৃষ্ঠার রায় পড়ে তাঁর মনে হয়েছে, চিঠি চালাচালি ও আর্থিক লেনদেনে দায়িত্বপ্রাপ্তরা অসতর্ক ছিলেন।
এ ঘটনায় বাফুফের অর্থ বিভাগের কাজের ভুল এবং দুর্বলতাও নাকি প্রকটভাবে ধরা পড়েছে তাঁর চোখে। বাফুফের অর্থ বিভাগের কর্মকর্তাদের পদত্যাগের আলোচনাও নাকি হয়েছে সেখানে। যেন সবকিছুর দায় নির্বাহীদের ওপর চাপিয়ে সালাউদ্দিন নিজেকে রাখতে চাইছেন নিরাপদ দূরত্বে।
শুক্রবার সন্ধ্যায় সোহাগের ওপর ফিফার নিষেধাজ্ঞার ঘোষণা আসার পরদিন বিকেলে সালাউদ্দিন সাংবাদিকদের মুখোমুখি হয়ে নিজেদের অবস্থান ব্যাখ্যা করেছেন। তিনি বলেছেন, আপাতত ফিফার সিদ্ধান্ত অনুযায়ীই তাঁরা কাজ করবেন। সোমবার (আজ) ফিফার জেনারেল সেক্রেটারির সঙ্গে কথা বলবেন। সভায় বসবেন বাফুফের নির্বাহী কমিটির সঙ্গেও। তারপর ঠিক করবেন পরবর্তী পদক্ষেপ। জরুরি সেই সভাটি বসার কথা আজ বিকেল চারটায় বাফুফে ভবনে।
সভায় আবু নাঈম সোহাগের জায়গায় বাফুফের ভারপ্রাপ্ত সাধারণ সম্পাদক মনোনীত হওয়ারও কথা আছে। এ ছাড়া ফিফার নিষেধাজ্ঞা ও যাবতীয় অনিয়মের অভিযোগ তদন্তের জন্য একটি কমিটি গঠনেরও সিদ্ধান্ত হতে পারে।
বাফুফের নির্বাহীদের সঙ্গে সালাউদ্দিনের আলোচনার বিষয় ও ধরনই মতিঝিলে বাফুফে ভবনের বর্তমান আবহটা বোঝাতে যথেষ্ট। এই থমথমে আবহের মধ্যেই কাল সেখানে অনুষ্ঠিত হয়েছে একটি সংবাদ সম্মেলন। যেটির বিষয় ছিল অবশ্য অন্য। আগামী সপ্তাহে এএফসি অনূর্ধ্ব–১৭ নারী চ্যাম্পিয়নশিপ বাছাইয়ে অংশ নিতে নারী দলের সিঙ্গাপুর সফর।
সেখানে বাফুফের নারী ফুটবলের প্রধান মাহফুজা আক্তারের সঙ্গে উপস্থিত ছিলেন নারী দলের পৃষ্ঠপোষক ঢাকা ব্যাংকের কর্মকর্তারাও। প্রসঙ্গক্রমে এসেছে অলিম্পিক বাছাই খেলতে মেয়েদের দলের মিয়ানমারে না যাওয়ার প্রসঙ্গ। এ নিয়ে ঢাকা ব্যাংকের উপব্যবস্থাপনা পরিচালক শেখ আবদুল বাকি যা বললেন, তাতে আরও একবার প্রশ্নের সম্মুখীন করতে হয় বাফুফেকেই।
এর আগে বাফুফে জানিয়েছিল, মেয়েদের মিয়ানমার পাঠানোর জন্য তাঁরা পৃষ্ঠপোষকদের কাছ থেকে ইতিবাচক সাড়া পাননি। কিন্তু শেখ আব্দুল বাকি দাবি করলেন, ঢাকা ব্যাংককে নাকি বিষয়টি জানানোই হয়নি। জানালে তাঁরা বাফুফের প্রস্তাব বিবেচনা করে দেখতেন।
ফিফার সিদ্ধান্তের পর বাফুফের আর্থিক স্বচ্ছতা নিয়ে কোনো শঙ্কা তৈরি হয়েছে কি না, এমন প্রশ্নও হয়েছে। তবে এ ব্যাপারে ঢাকা ব্যাংকের অবস্থান পরিষ্কার—বাংলাদেশ নারী ফুটবল দলের পৃষ্ঠপোষক হিসেবে তাঁরা গর্বিত।