বিখ্যাত বিনিয়োগগুরু খ্যাত এবং বিশ্বের অন্যতম ধনী ব্যক্তি ওয়ারেন বাফেট (৯৪) অবশেষে বার্কশায়ার হ্যাথাওয়ের প্রধান নির্বাহীর (সিইও) পদ থেকে অবসরের ঘোষণা দিয়েছেন। তিনি জানিয়েছেন, চলতি বছরের শেষে তিনি দায়িত্ব হস্তান্তর করবেন প্রতিষ্ঠানটির ভাইস-চেয়ারম্যান গ্রেগ অ্যাবেলের কাছে।
ওমাহায় বার্কশায়ার হ্যাথাওয়ের বার্ষিক সভায় এই ঘোষণা দিয়ে বাফেট বলেন, “আমার মনে হচ্ছে, এখন সময় হয়েছে গ্রেগের এই দায়িত্ব নেওয়ার।”
তিনি আরও জানান, তাঁর এই সিদ্ধান্ত সম্পর্কে আগেই কেবল তাঁর দুই সন্তান হাওয়ার্ড ও সুজি বাফেট জানতেন।
ঘোষণার পর উপস্থিত প্রায় ৪০ হাজার দর্শক করতালিতে ফেটে পড়েন, যার উত্তরে বাফেট কৌতুক করে বলেন, “এই উচ্ছ্বাসের মানে দুই ভাবে ব্যাখ্যা করা যেতে পারে!”
গ্রেগ অ্যাবেল, যিনি ২০২১ সালেই বাফেটের হাতে বাছাই হয়েছিলেন উত্তরসূরি হিসেবে, এই ঘোষণায় কিছুটা বিস্মিতই হন বলে জানা গেছে। যদিও চার বছর আগে তাঁর নাম ঘোষণা করা হয়েছিল, তখন বাফেট অবসরের কোনও ইঙ্গিত দেননি।
বাফেট বলেন, “আমি বার্কশায়ারের একটি শেয়ারও বিক্রি করব না। এগুলো দান করে দেওয়া হবে।” তাঁর এই ঘোষণায় দর্শকদের মধ্যে উৎসাহের ঝড় ওঠে।
উদ্যোক্তা ও বিনিয়োগকারীদের জন্যে ওয়ারেন বাফেটের গুরুত্তপূর্ণ কিছু পরামর্শ
অ্যাপল সিইও টিম কুক এক্স/টুইটারে প্রতিক্রিয়া জানিয়ে বলেন, “ওয়ারেনের মতো কেউ নেই। তাঁর প্রজ্ঞা আমার মতো অসংখ্য মানুষকে অনুপ্রাণিত করেছে। গ্রেগ অ্যাবেলের নেতৃত্বে বার্কশায়ার দুর্দান্ত ভাবে এগিয়ে যাবে, এতে কোনও সন্দেহ নেই।”
বার্কশায়ার হ্যাথাওয়ে বর্তমানে ৬০টিরও বেশি কোম্পানির মালিক, যার মধ্যে আছে জাইকো (Geico), ডিউরাসেল (Duracell), এবং ডেইরি কুইন (Dairy Queen)। এছাড়াও অ্যাপল, কোকা কোলা, ব্যাংক অব আমেরিকা ও আমেরিকান এক্সপ্রেসের মতো বৃহৎ কোম্পানিতেও রয়েছে তাদের বড় অংশীদারিত্ব।
সম্প্রতি ব্লুমবার্গ ওয়ারেন বাফেটকে বিশ্বের পঞ্চম ধনী ব্যক্তি হিসেবে ঘোষণা করেছে, যার মোট সম্পদের পরিমাণ ১৬৮ বিলিয়ন মার্কিন ডলার। ছোটবেলায় মাত্র ৬ বছর বয়সে উপার্জন শুরু করা বাফেট ১১ বছর বয়সে প্রথম শেয়ার কেনেন এবং ১৩ বছর বয়সে প্রথম ট্যাক্স রিটার্ন জমা দেন।
বহু সম্পদ অর্জন করলেও বাফেট বিগত ৬৫ বছর ধরে একই সাধারণ বাড়িতে বসবাস করছেন ওমাহায়।
সভায় বাফেট আন্তর্জাতিক বাণিজ্য নিয়েও মত দেন। তিনি মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের ট্যারিফ নীতির সমালোচনা করে বলেন, “বাণিজ্যকে অস্ত্র হিসেবে ব্যবহার করা উচিত নয়। আমেরিকার উচিত বাকি বিশ্বের সঙ্গে সহযোগিতামূলক বাণিজ্যে অংশ নেওয়া।”
ওয়ারেন বাফেট প্রতিবছরই বিনিয়োগকারীদের উদ্দেশে একটি করে চিঠি লিখে আসছেন। তাঁর সেই বার্ষিক চিঠিটি বিনিয়োগকারীদের কাছে অবশ্যপাঠ্য হয়ে উঠেছে। এবারের চিঠিতেও তিনি অনেক জ্ঞানগর্ভ কথা বলেছেন। বিশেষ করে নিজের উত্তরসূরি হিসেবে যাঁর নাম ঘোষণা করেছেন সেই গ্রেগ আবেল সম্পর্কে বেশ কিছু কথা বলেছেন।
চিঠিতে বাফেট লিখেছেন, ‘আমার বয়স ৯৪ বছর হয়েছে। যাওয়ার সময় হয়ে গেছে, শিগগিরই গ্রেগ আবেল আমার জায়গায় কোম্পানির প্রধান নির্বাহীর আসন অলংকৃত করবেন। গ্রেগের সঙ্গে আমার মিল হলো, তিনিও আমার মতো বিশ্বাস করেন। বছর শেষে কোম্পানির প্রধান নির্বাহীর দায়িত্ব হলো, বিনিয়োগকারীদের এই বার্ষিক চিঠি লেখা। আবেল বোঝেন, বিনিয়োগকারীদের ঠকানো প্রকারান্তরে নিজেকেই ঠকানো এবং একসময় আপনি নিজেই তা বিশ্বাস করবেন।’
আবেল সম্পর্কে বাফেট আরও বলেন, তিনি দুই দশক বা ২০ বছরেরও বেশি সময় ধরে বার্কশায়ার হ্যাথাওয়েতে আছেন এবং কোম্পানির বিদেশি বিনিয়োগ দেখাশোনা করেন। জীবন সম্পর্কে তাঁর দৃষ্টিভঙ্গি ইতিবাচক। একই সঙ্গে নিজের জ্ঞান ভাগাভাগি ও বিতরণে সচেষ্ট তিনি।
২০০৭ সালে বিনিয়োগকারীদের উদ্দেশে লেখা চিঠিতে ব্যবসা সম্পর্কে বাফেটের দৃষ্টিভঙ্গি ফুটে ওঠে। তিনি লেখেন, ‘যে ব্যবসায় দ্রুত প্রবৃদ্ধি হয়, সেটা সবচেয়ে খারাপ ব্যবসা। অন্যদিকে যে ব্যবসায় প্রবৃদ্ধি অর্জন করতে বিপুল পরিমাণে বিনিয়োগ প্রয়োজন হয়, কিন্তু তা থেকে খুব সামান্য আয় হয়, সেটিও সবচেয়ে খারাপ ব্যবসা।’ এ ক্ষেত্রে তিনি বিমান পরিবহন সংস্থার ব্যবসার কথা উল্লেখ করেছেন।
তিনি বলেছেন, এই খাতে প্রতিযোগিতামূলক সুবিধার কোনো বালাই নেই। এ কারণে এ ব্যবসায় প্রতিযোগিতা অনেক বেশি, খরচও বেশি। সে জন্য তিনি মনে করেন, বিমান পরিবহন ব্যবসা বিনিয়োগকারীদের জন্য গোরস্থানের শামিল।
১৯৮৯ সালে বাফেট ইউএস এয়ারওয়েজ কোম্পানিতে বিনিয়োগ করে বোকামি করেছেন বলে উল্লেখ করেন। তবে ভাগ্য ভালো যে বিমান সংস্থাটি দেউলিয়া হয়ে যাওয়ার আগেই সেটির শেয়ার বিক্রি করতে পেরেছিল তাঁর কোম্পানি।
নতুন ব্যবসায় বিনিয়োগ করার আগে বাফেট তিনটি বিষয়ে জোর দেওয়ার পরামর্শ দিয়েছেন। ২০১৯ সালের চিঠিতে তিনি লিখেছিলেন, নতুন ব্যবসায়ে বিনিয়োগ করার আগে রিটার্ন অন ট্যানজিবল ক্যাপিটাল বা দৃষ্টিগ্রাহ্য পুঁজি থেকে প্রাপ্ত ফল; দক্ষ ও সৎ ব্যবস্থাপনা এবং যৌক্তিক মূল্য—এই তিনটি বিষয়ে নজর রাখতে হবে।
নতুন ব্যবসা অধিগ্রহণ সম্পর্কে তাঁর মত, এটা অনেকটা বিয়ের মতো; মিলনটা বেশ মধুর, কিন্তু এরপর বাস্তবতার সঙ্গে প্রত্যাশার ফারাক হতে শুরু করে। কখনো কখনো এমন হয়, নতুন এই মিলন থেকে অপ্রত্যাশিত অনেক কিছু ঘটে যায়, যে বিষয়টি হয়তো কোনো পক্ষই আগে ভাবেনি। অন্যান্য ক্ষেত্রে দেখা যায়, অতিদ্রুত স্বপ্নভঙ্গ হয়। করপোরেট জগৎ নিয়ে বাফেট বলেন, সাধারণত ক্রেতাদের বাজে অভিজ্ঞতার সম্মুখীন হতে হয়। বিষয়টি হলো বিনিয়োগের আগে দুই চোখ স্বপ্নে বিভোর হতে পারে, কিন্তু বাস্তবতা ঠিক সেই জায়গায় থাকে না।
একবার ওয়ারেন বাফেটের কাছে জানতে চাওয়া হয়েছিল, অর্থ উপার্জন ও নিজের নিরাপদ ভবিষ্যৎ তৈরির ক্ষেত্রে সাধারণ মানুষের জন্য তাঁর পরামর্শ কী। তখন তিনি জবাবে বলেছিলেন, প্রথমেই উচিত বন্ধকি ঋণ পরিশোধ করা। তাঁর মতে, বন্ধকের অতিরিক্ত অর্থ দ্রুত পরিশোধের দুটি অর্থ। এক সুদের অর্থ বাঁচানো এবং দুই. বন্ধক থেকে মুক্তি, যার মানে এই টাকা জোগাড় করতে প্রতি মাসে এত পরিশ্রম করতে হবে না। এককথায় এটি নিরাপদ বিনিয়োগ।
ওয়ারেন বাফেট প্রায়ই একটা কথা বলেন, সঞ্চয়ের সুরক্ষিত জাল তৈরি করতে হবে। যথাযথ বিনিয়োগের আগে উদ্যোক্তাকে অবশ্যই কমপক্ষে ছয় মাস আগে থেকে জীবনযাত্রার ব্যয় (শুধু বেঁচে থাকার বাজেটের জন্য যা লাগে তা ছাড়া) কমাতে সর্বোচ্চ চেষ্টা করতে হবে। এর অর্থ হলো, যদি হঠাৎ করে আপনার কিছুটা নগদ অর্থের প্রয়োজন হয়, বিনিয়োগের ক্ষেত্রে বিপদে পড়লে তা সামাল দিতে পারবেন ওই অর্থ দিয়ে।
উদ্যোক্তাদের জন্য বহুবছর এ রকম নানা পরামর্শ দিয়ে আসছেন বাফেট। অবসরের ঘোষণা দেয়াতে আগামীতে আর পাওয়া যাবেনা হয়ত বার্ষিক চিঠি।