দুর্নীতি ও ঋণ খেলাপি কেলেঙ্কারি তদন্তে জড়িত থাকা সত্ত্বেও, বেক্সিমকো গ্রুপের লাভজনক উৎপাদনকারী প্রতিষ্ঠানগুলিকে কঠোর শর্তে লেটার অফ ক্রেডিট (এলসি) খোলার অনুমতি দেওয়ার জন্য বাংলাদেশ ব্যাংক নির্দেশনা দিয়েছে।
গত শনিবার (২৪ মে) ২০টি ব্যাংক এবং সাতটি নন–ব্যাংক আর্থিক প্রতিষ্ঠানের শীর্ষনির্বাহীদের সাথে অনুষ্ঠিত উচ্চ পর্যায়ের বৈঠকে বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নর আহসান এইচ মনসুর এই নির্দেশনা অনুমোদন করেন। আন্তর্জাতিক বিষয়ক প্রধান উপদেষ্টার দূত লুৎফয়সিদ্দিকীও উপস্থিত ছিলেন বলে জানা গেছে।
কেন্দ্রীয় ব্যাংকের একজন উর্ধ্বতন কর্মকর্তা জানিয়েছেন, আগামী দিনে এই নির্দেশনার রূপরেখা সম্বলিত চিঠি ব্যাংকগুলোতে পাঠানো হতে পারে।
ব্যাংকিং নিয়ম অনুসারে, যদি একটি গ্রুপের মধ্যে কোনও কোম্পানি ঋণ খেলাপি হয়, তাহলে খেলাপি কোম্পানি এবং এর সহযোগী প্রতিষ্ঠানগুলিকে সাধারণত আরও ঋণ গ্রহণ থেকে বিরত রাখা হয়।
যেহেতু এলসিগুলোকে ঋণ হিসাবে গণ্য করা গ্যারান্টি দ্বারা সমর্থিত করা হয়, তাই ব্যাংকগুলো বেক্সিমকো কোম্পানিগুলোর জন্য এলসি খুলতে অনিচ্ছুক, যার মধ্যে অনেকগুলো খেলাপি হয়েছে। এই পরিস্থিতি মোকাবেলায় কেন্দ্রীয় ব্যাংক তার নির্দেশনা জারি করেছে।
এবি ব্যাংকের ব্যবস্থাপনা পরিচালক গনমাধ্যম কর্মীদের বলেন, “বেক্সিমকো সম্পর্কে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের প্রস্তাব অবশ্যই ইতিবাচক। আমরা নির্দেশাবলী অনুসরণ করার জন্য যথাসাধ্য চেষ্টা করবো। তবে ‘আমরা এখনও পর্যালোচনা করছি যে কোন বেক্সিমকো কোম্পানিগুলো ব্যাংকিং সুবিধার জন্য যোগ্য হবে।‘
জনতা ব্যাংকের ব্যবস্থাপনা পরিচালক বলেন বেক্সিমকো ফার্মা আমাদের ব্যাংক থেকে ঋণ নিয়েছে। আমাদের কোম্পানির আমদানি এলসি সঠিক ভাবে ইস্যু করার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। একই সাথে, বেক্সিমকো গ্রুপের খেলাপি ঋণ পুনরুদ্ধারের জন্য প্রয়োজনীয় ব্যবস্থাগ্রহণ করতেও বলা হয়েছে। আমরা সেই অনুযায়ী ব্যবস্থা নেব।
সভায় উপস্থিত ব্যাংক কর্মকর্তারা বলেন, বেক্সিমকো গ্রুপের কিছু কোম্পানি আর্থিক সংকটে থাকলেও, বেক্সিমকো ফার্মাসিউটিক্যালস, শাইনপুকুর সিরামিকস এবং এর সৌর উদ্যোগগুলো লাভজনক অবস্থায় রয়েছে। গভর্নর বিশেষভাবে ব্যাংকগুলোকে এই কার্যকর ব্যবসাগুলোর জন্য এলসি খোলার সুবিধা প্রদান এবং কার্যকরী মূলধন সহায়তা বিবেচনাকরার নির্দেশ দিয়েছেন।
বাংলাদেশ ব্যাংকের অন্য একজন উর্ধ্বতন কর্মকর্তা বলেন, গভর্নর বেক্সিমকোর সক্রিয় প্রতিষ্ঠানগুলো চালু রাখার গুরুত্বের উপর জোর দিয়েছেন, কারণ এখানে বিপুল সংখ্যকলোক কাজ করে জীবিকা নির্বাহ করছেন। আর্থিক পুনরুদ্ধারে সহায়তা করার জন্য ব্যাংকগুলোকেও গ্রুপের রপ্তানি কার্যক্রম টিকিয়ে রাখতে বলা হয়েছে।
ঢাকা ব্যাংকের ব্যবস্থাপনা পরিচালক বলেন, ‘বেক্সিমকো গ্রুপের সমস্যাগ্রস্ত কোম্পানিগুলোর বিষয়ে আমাদের নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে এবং ভালো কোম্পানি গুলোকে তাদের ব্যবসা চালিয়ে যেতে সহায়তা করতে বলা হয়েছে।‘
তিনি আরও বলেন, যদি কোম্পানিগুলো সঠিক ভাবে কাজ করতে পারে, তাহলে তাদের কাছথেকে খেলাপি ঋণ আদায় করা সম্ভব হবে, যা শেষ পর্যন্ত ব্যাংকিং খাতের জন্য উপকারী হবে।
একটি বেসরকারি ব্যাংকের ব্যবস্থাপনা পরিচালক বলেন, তাদের এও নিশ্চিত করতে বলা হয়েছে যে রপ্তানি আয় এলসি ইস্যুকারী ব্যাংকগুলোর অ্যাকাউন্টে জমা করা হবে এবং এক খাতের তহবিল অন্য খাতে স্থানান্তরিত করা হবে না।
এছাড়াও কেন্দ্রীয় ব্যাংক বেক্সিমকোর সুকুক বন্ডে বিনিয়োগ করা গ্রাহকদের তহবিল ফেরত দেওয়ার প্রক্রিয়াও পর্যালোচনা করছে।
বেক্সিমকো গ্রুপের ভাইস–চেয়ারম্যান সালমান এফ রহমান গ্রেপ্তারের পর থেকে তার পরিচালিত কোম্পানিগুলোর চ্যালেঞ্জের মুখোমুখি হতে হচ্ছে।
কিছু লোকসানি কারখানাকে ছাঁটাই ঘোষণা করা হলেও, বেক্সিমকো ফার্মাসিউটিক্যালস এবং শাইনপুকুর সিরামিকসের মতো লাভজনক প্রতিষ্ঠানগুলো এখনও চালু রয়েছে।
গত ডিসেম্বরে হাইকোর্টে দাখিল করা বাংলাদেশ ব্যাংকের প্রতিবেদন অনুসারে, বেক্সিমকো গ্রুপের ৭৮টি কোম্পানির ১৬টি ব্যাংক এবং সাতটি আর্থিক প্রতিষ্ঠানের কাছে প্রায় ৫০হাজার কোটি টাকা পাওনা রয়েছে। এর মধ্যে গত বছরের ৩০ নভেম্বর পর্যন্ত ৩১,০০০ কোটি টাকা খেলাপি হিসেবে শ্রেণীবদ্ধ করা হয়েছে।
জানা গেছে, বেক্সিমকো ইন্ডাস্ট্রিয়াল পার্কে অবস্থিত ১৬টি কোম্পানির নামে প্রায় ১২ হাজার কোটি টাকা ঋণ নিয়েছে, যদিও এই কারখানাগুলো কেবল কাগজে কলমে বিদ্যমান।