ঢাকা শেয়ার বাজার

২৮ ফেব্রুয়ারি ২০২৬ শনিবার ১৫ ফাল্গুন ১৪৩২

ব্রোকার হাউজের টার্গেট ভিত্তিক লেনদেন ও মার্জিন লোনের ফাঁদে শেয়ারবাজার: বিনিয়োগকারীরা সতর্ক থাকুন

সবার আগে শেয়ার বাজারের নির্ভর যোগ্য খবর পেতে আপনার ফেসবুক থেকে  “ঢাকা শেয়ার বাজার ডট কম” ফেসবুক পেজে লাইক করে রাখুন, সবার আগে আপনার ওয়ালে দেখতে। লাইক করতে লিংকে ক্লিক করুন  facebook.com/dhakasharebazar2024

গত কয়েক বছর ধরে দেশের শেয়ারবাজারে ব্রোকার হাউজ ও মার্চেন্ট ব্যাংকগুলোতে এক ধরনের নোংরা প্রতিযোগিতা স্পষ্ট হয়ে উঠেছে। অনেক প্রতিষ্ঠানে কর্মকর্তা-কর্মচারীদের মূল্যায়নের প্রধান মানদণ্ড হয়ে দাঁড়িয়েছে ফান্ডের পরিমাণ ও দৈনিক ট্রেড ভলিউম। যার ফান্ড বেশি, যার লেনদেন বেশি, তার বেতন বেশি এবং বাজারে তার চাহিদাও বেশি।

এ পরিস্থিতিতে সদ্য পাশ করা কিছু তরুণ, বিশেষ করে যাদের পারিবারিক বা আত্মীয়স্বজনের বেশি টাকা পয়সা রয়েছে, তারা দ্রুত বাজারে সক্রিয় হয়ে উঠছে। অনেক ক্ষেত্রে ঝুঁকি বা বাজার বিশ্লেষণ না বুঝেই বড় অঙ্কের দৈনিক লেনদেনের মাধ্যমে সংশ্লিষ্ট হাউজের টার্নওভার বাড়ানো হচ্ছে। এক-দেড় বছরের মধ্যেই তাদের “সফল” হিসেবে পরিচিতি তৈরি হয়, এরপর বেশি বেতনে অন্য প্রতিষ্ঠানে যোগদানের প্রবণতাও দেখা যাচ্ছে।

কালো টাকার প্রবেশ ও টার্নওভার বাড়ানোর দৌড়

বাজারসংশ্লিষ্ট অনেকের অভিযোগ, কিছু বড় ব্রোকার হাউজ ও মার্চেন্ট ব্যাংক টার্নওভার বাড়ানোর প্রতিযোগিতায় অস্বাভাবিক বেতন কাঠামো তৈরি করছে এবং প্রতিদ্বন্দ্বী প্রতিষ্ঠানের কর্মকর্তাদের টেনে নিচ্ছে। একই সঙ্গে কিছু ক্ষেত্রে অঘোষিত বা কালো টাকার ক্লায়েন্ট সংগ্রহ করে লেনদেন বাড়ানোর প্রবণতাও রয়েছে।

গ্রাহক টানতে অতিরিক্ত মার্জিন ঋণ সুবিধা, বিশেষ প্রলোভন কিংবা অযৌক্তিক সুবিধা দেওয়ার অভিযোগও রয়েছে। এতে সাময়িকভাবে লেনদেন বাড়লেও দীর্ঘমেয়াদে ঝুঁকি তৈরি হচ্ছে পুরো বাজারে।

ট্রেড টার্গেট ও মার্জিন লোনের ফাঁদ

মার্চেন্ট ব্যাংকের ট্রেডারদের নির্দিষ্ট ট্রেড টার্গেট অনেক সময় গ্রাহকদের অযথা লেনদেনে উৎসাহিত করে। ভুল সময়ে মার্জিন লোন নেওয়া, ঘন ঘন শেয়ার কেনাবেচা— এসব সিদ্ধান্তে ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছেন সাধারণ বিনিয়োগকারীরা।

অনেক ক্ষেত্রে গ্রাহকরা লোন রেশিও ও ঝুঁকির সীমা না বুঝেই অতিরিক্ত মার্জিন সুবিধা নিচ্ছেন। কিন্তু শেয়ারের দাম নির্দিষ্ট সীমার নিচে নামলেই প্রতিষ্ঠানগুলো ফোর্স সেলে যায়। তখন বিনিয়োগকারীর মূলধন দ্রুত ক্ষয়ে যায়।

২০১৯ সালের শেষ ভাগ ও ২০২০ সালের শুরুর দিকে ব্যাপক ফোর্স সেলের ঘটনা বাজারে বড় ধাক্কা দিয়েছিল। বিভিন্ন শেয়ারে একযোগে বিক্রির চাপ সৃষ্টি হয়ে বাজার অস্থির হয়ে পড়ে। পরবর্তীতে ফ্লোর প্রাইস চালু হওয়ার পর এবং রাজনৈতিক অস্থিরতার সময়েও ফোর্স সেলের প্রভাব বাজারে দৃশ্যমান ছিল। সর্বশেষ ২০২৪ সালে আওয়ামী সরকার পতনের পরে ২০২৪ ও ২০২৫ সালে বিক্রির চাপে সূচক পড়ে যায় এবং অনেক বিনিয়োগকারী বড় ক্ষতির মুখে পড়েন।

এভাবে অনভিজ্ঞ কর্মকর্তা-কর্মচারীদের ভুল সিদ্ধান্তে লোভে পরে বড়ো বড়ো অনেক বিনিয়োগকারী ক্ষতিগ্রস্ত হয়ে শেয়ারবাজার বিমুখ হচ্ছেন। তারা লস করে শুধু শেয়ারবাজার বিমুখই হচ্ছেন না, পরিচিত লোকজনকে শেয়ার বাজার নিয়ে ভুল মেসেজ দিচ্ছেন যে শেয়ার বাজার মানেই জুয়া ওখানে যাওয়া যাবেনা। শেয়ার বাজারে যাওয়া মানে নিশ্চিত লস।

আস্থাহীনতা ও নিয়ন্ত্রক দুর্বলতা

শেয়ারবাজারে নিয়ম কানুন থাকলেও অনেক ক্ষেত্রে তার যথাযথ অনুসরণ বা তদারকি হয় না। অতিরিক্ত মার্জিন সুবিধা, লোন রেশিওর অপব্যবহার কিংবা ঝুঁকিপূর্ণ ক্লায়েন্ট ব্যবস্থাপনায় কার্যকর নজরদারির অভাব বাজারে আস্থার সংকট তৈরি করছে।

রাজনৈতিক পরিবর্তন, নীতিগত হঠকারী সিদ্ধান্ত এবং বড় অঙ্কের অর্থ বাজার থেকে বেরিয়ে যাওয়াও বিক্রির চাপ বাড়িয়েছে। তবে বিশ্লেষকদের একটি অংশের মত, মাত্রাতিরিক্ত মার্জিন লোন না থাকলে পতনের মাত্রা এত গভীর হতো না।

বিনিয়োগকারীদের জন্য সতর্কতা

শেয়ারবাজারে বাস্তব অভিজ্ঞতা ও ঝুঁকি ব্যবস্থাপনার জ্ঞান ছাড়া মার্জিন লোন নেওয়া অত্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণ। ধার করা টাকা, উচ্চ সুদে নেওয়া অর্থ কিংবা আত্মীয়স্বজনের কাছ থেকে চড়া সুদে আনা টাকা নিয়ে শেয়ারবাজারে বিনিয়োগ করা অনেক ক্ষেত্রে আত্মঘাতী সিদ্ধান্তে পরিণত হচ্ছে।

বাস্তবে বছরে ১৫ থেকে ২০ শতাংশ সুদে অর্থ নিয়ে শেয়ারবাজারে টিকে থাকা প্রায় অসম্ভব। গত একবছরে আমার পরিচিত বেশ কয়েকজন বড়ো বিনিয়োগকারী ফোর্স সেলের কবলে পরে পুরো টাকা হারিয়েছেন। বেশি পরিমাণে মার্জিন লোন নেয়া থাকলে শেয়ারবাজারের সামান্য ওঠানামাতেই মূলধন ও সুদের চাপ সামাল দেওয়া কঠিন হয়ে পড়ে।

শেয়ারবাজারে মার্জিন লোন ও অন্য বিষয় করণীয় কিছু গুরুত্বপূর্ণ বিষয়

খুব প্রয়োজন ছাড়া মার্জিন লোন এড়িয়ে চলা।
লোন নিলেও স্বল্প সময়ের জন্য নেওয়া।
ধার বা উচ্চ সুদে নেওয়া অর্থ দিয়ে বিনিয়োগ না করা।
এমন অর্থই বিনিয়োগ করা, যা আগামী ৪-৫ বছরে প্রয়োজন হবে না।
ঝুঁকি, লোন রেশিও ও ফোর্স সেলের নিয়ম পরিষ্কার ভাবে বুঝে তবেই সিদ্ধান্ত নেওয়া

সবশেষে মনে রাখতে হবে, শেয়ারবাজারে টিকে থাকার মূল শর্ত ধৈর্য, জ্ঞান ও ঝুঁকি নিয়ন্ত্রণ। অল্প সময়ে বেশি লাভের আশায় ঋণনির্ভর বিনিয়োগ অনেক সময় সর্বনাশ ডেকে আনে। মার্জিন লোনকে “সহায়ক হাতিয়ার” নয়, বরং উচ্চ ঝুঁকির আর্থিক দায় হিসেবেই দেখা উচিত।

Author

  • মোঃ জসিম উদ্দিন তালুকদার দেশের পুঁজিবাজারের সাথে সরাসরি যুক্ত। তিনি উপ-মহাব্যবস্থাপক, জাহান সিকিউরিটিজ লিমিটেডের। পোর্টফোলিও পরিচালনায় সুদক্ষ ও অভিজ্ঞতা সম্পন্ন। তিনি ২০ বছর ধরে অত্যন্ত সুনামের সহিত পুঁজিবাজারের সাথে যুক্ত আছেন।

    View all posts
Share on facebook
Facebook
Share on whatsapp
WhatsApp
Share on twitter
Twitter
Share on linkedin
LinkedIn
আপনি এটাও পড়তে পারেন
শেয়ার বাজার

আপনি এই পৃষ্ঠার কন্টেন্ট কপি করতে পারবেন না।