দেশের শেয়ার বাজারের বহুল আলোচিত-সমালোচিত দুই ব্যক্তি চৌধুরী হাসান তাহের ইমাম ও নাফিজ সরাফাতের বেনিফিসিয়াল ওনারর্স অ্যাকাউন্ট (বিও অ্যাকাউন্ট) স্থগিত করা হয়েছে। শেয়ার বাজার নিয়ন্ত্রক সংস্থা বাংলাদেশ সিকিউরিটিজ অ্যান্ড এক্সচেঞ্জ কমিশন (বিএসইসি) গতকাল বৃহস্পতিবার এ বিষয়ে একটি আদেশ জারি করেছে।
তদন্ত কার্যক্রমের অংশ হিসেবে গত বুধবার ব্রোকারেজ হাউজ মাল্টি সিকিউরিটিজ অ্যান্ড সার্ভিসেস লিমিটেডের কার্যালয় পরিদর্শনে গিয়েছিলেন বাংলাদেশ সিকিউরিটিজ অ্যান্ড এক্সচেঞ্জ কমিশনের (বিএসইসি) কর্মকর্তারা। ব্রোকারেজ হাউজটির মালিকানায় রয়েছে সম্পদ ব্যবস্থাপনা প্রতিষ্ঠান বাংলাদেশ রেইস ম্যানেজমেন্ট পিসিএল। তবে ব্রোকারেজ হাউজটির কর্মকর্তারা বিএসইসির তদন্ত কমিটির সদস্যদের পরিদর্শন কার্যক্রম পরিচালনায় বাধা দেন এবং তাদের কার্যালয়ে প্রবেশে বাধা দেন।
বিএসইসির তদন্ত কমিটির সদস্যদের পরিদর্শন কার্যক্রম পরিচালনায় বাধা দেওয়ায় বিএসইসির পক্ষ থেকে রেইসের চেয়ারম্যান চৌধুরী নাফিজ সরাফাত, ব্যবস্থাপনা পরিচালক হাসান তাহের ইমাম ও মাল্টি সিকিউরিটিজের প্রধান নির্বাহী মো. জালাল ইকরামুল কবীরের বিও হিসাবের মাধ্যমে সব ধরনের লেনদেন ও হস্তান্তর স্থগিতের আদেশ দেয়া হয়েছে। পাশাপাশি ব্রোকারেজ হাউজটির বিষয়ে আরো বেশকিছু নির্দেশনা দেয়া হয়েছে। গতকাল এ বিষয়ে বিএসইসির পক্ষ থেকে একটি আদেশ জারি করা হয়েছে।
বিএসইসির চেয়ারম্যান রাশেদ মাকসুদ স্বাক্ষরিত আদেশে বলা হয়েছে, সংস্থাটির তদন্ত কমিটির সদস্যরা ২১ আগস্ট বেলা সাড়ে ১১টায় মাল্টি সিকিউরিটিজ অ্যান্ড সার্ভিসেসের কার্যালয় পরিদর্শনে গিয়েছিলেন। কিন্তু ব্রোকারেজ হাউজটির কর্মকর্তারা তদন্ত কমিটির সদস্যদের সহায়তা করেননি। তারা কোনো ধরনের কাগজপত্র সরবরাহ করেননি এবং কার্যালয় পরিদর্শনের অনুমতি দেননি। ব্রোকারেজ হাউজটির এ ধরনের কার্যক্রম সিকিউরিটিজ আইনের স্পষ্ট লঙ্ঘন।
বিএসইসির আদেশে বলা হয়েছে, পরিদর্শন করতে না পারার কারণে তদন্ত কমিটি ব্রোকারেজ হাউজটির ব্যাক অফিস সফটওয়্যার, সংশ্লিষ্ট বুক অব রেকর্ডস ও তথ্য যাচাই করতে পারেনি এবং কোনো ধরনের প্রমাণ সংগ্রহ করতে পারেনি। ফলে সংশ্লিষ্ট ব্রোকারেজ হাউজে থাকা বিও হিসাবধারীদের সম্পদ ও সিকিউরিটিজ এবং স্টক ব্রোকারের ডিপোজিটরি পার্টিসিপ্যান্টের নিয়ন্ত্রণে থাকা সিকিউরিটিজের নিরাপত্তা ও সুরক্ষার বিষয়ে শঙ্কা প্রকাশ করছে তদন্ত কমিটি। তাছাড়া মাল্টি সিকিউরিটিজ, হাসান তাহের ইমাম ও চৌধুরী নাফিজ সরাফাত ও তাদের সঙ্গে সম্পর্কিত ব্যক্তিদের মধ্যে সন্দেহজনক লেনদেনের বিষয়ে তদন্ত কমিটি অন্ধকারে রয়েছে। এ অবস্থায় বিনিয়োগকারীদের স্বার্থ সুরক্ষা ও নিরাপত্তা নিশ্চিতের পাশাপাশি মাল্টি সিকিউরিটিজের কাছে থাকা সিকিউরিটিজের নিরাপত্তার জন্য বেশ কিছু নির্দেশনা দিয়েছে।
কমিশনের নির্দেশনা অনুসারে, মাল্টি সিকিউরিটিজের নন-মার্জিন লিমিট বা ফ্রি মার্জিন সুবিধা পরবর্তী নির্দেশ না দেয়া পর্যন্ত স্থগিত থাকবে। স্টক এক্সচেঞ্জে মালিকানার বিপরীতে মাল্টি সিকিউরিটিজের প্রাপ্য লভ্যাংশ পরিশোধের বিষয়টি স্থাগিত থাকবে। ব্রোকারেজ হাউজটি আইপিও, আরপিও এবং কিউআইওতে যোগ্য বিনিয়োগকারীর (ইআই) কোটা সুবিধা ভোগ করতে পারবে না। স্টক ব্রোকার ও ডিপোজিটরি পার্টিসিপ্যান্ট হিসেবে মাল্টি সিকিউরিটিজের নিবন্ধন সনদ নবায়ন স্থগিত থাকবে। নতুন শাখা কিংবা ডিজিটাল বুথ খোলা স্থগিত থাকবে। মাল্টি সিকিউরিটিজের প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা (সিইও) মো. জালাল ইকরামুল কবীর, হাসান তাহের ইমাম ও চৌধুরী নাফিজ সরাফাতের মূল ও সংযুক্ত বিও হিসাবের মাধ্যমে সব ধরনের সিকিউরিটিজ লেনদেন ও স্থানান্তর স্থগিত থাকবে। ব্রোকারেজ হাউজটি থেকে আলোচ্য ব্যক্তি কোনো ধরনের পরিশোধ বা সিকিউরিটিজ স্থানান্তর স্থগিত থাকবে। বিএসইসির কাছ থেকে পরবর্তী আদেশ না দেয়া পর্যন্ত এসব স্থগিতাদেশ কার্যকর থাকবে।
মাল্টি সিকিউরিটিজের সমন্বিত গ্রাহক হিসাবে (সিসিএ) ঘাটতি সমন্বয়ের পর সংশ্লিষ্ট স্টক এক্সচেঞ্জ এক বছর পর্যন্ত ব্রোকারেজ হাউজটির কার্যক্রম বিশেষ নজরদারির মধ্যে রাখবে। পাশাপাশি সিসিএ ও ডিপোজিটরি পার্টিসিপ্যান্টের কাছে রক্ষিত সিকিউরিটিজ প্রতি মাসে দুবার পরীক্ষা করতে হবে। ঢাকা স্টক এক্সচেঞ্জ (ডিএসই), চট্টগ্রাম স্টক এক্সচেঞ্জ (সিএসই) ও সেন্ট্রাল ডিপোজিটরি বাংলাদেশ লিমিটেডকে (সিডিবিএল) এসব নির্দেশনা বাস্তবায়নে প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ গ্রহণের জন্য বলা হয়েছে এবং সাত কার্যদিবসের মধ্যে আলোচ্য ব্যক্তিদের মূল ও সংযুক্ত বিও হিসাবের তথ্যসহ কমিশনের কাছে প্রতিবেদন দাখিল করতে নির্দেশ দিয়েছে বিএসইসি।
প্রসঙ্গত, রেইস নিজেদের ব্যবস্থাপনাধীন ফান্ডের মাধ্যমে ব্লক মার্কেটে বড় ধরনের লেনদেন করেছে। পাশাপাশি বাংলাদেশ ফিক্সড ইনকাম ইনভেস্টমেন্ট স্পেশাল পারপাস ভেহিকলের মাধ্যমেও লেনদেন করা হয়েছে, যেটি রেসের ব্যবস্থাপনাধীন ফান্ড। এক্ষেত্রে মিউচুয়াল ফান্ড বিধিমালা লঙ্ঘন করে এসব লেনদেন করা হয়েছে। এ কারণে পরবর্তী নির্দেশ না দেয়া পর্যন্ত বাংলাদেশ ফিক্সড ইনকাম ইনভেস্টমেন্ট স্পেশাল পারপাস ভেহিকল বা এ-জাতীয় নামে রেসের ব্যবস্থাপনাধীন অন্যান্য ফান্ডের ব্লক মার্কেটে লেনদেন স্থগিত করেছে বিএসইসি। পাশাপাশি মাল্টি সিকিউরিটিজের ব্লক মার্কেটে লেনদেন সুবিধাও স্থগিত করা হয়। গত ৪ জুলাই বিএসইসির পক্ষ থেকে এ-সংক্রান্ত একটি আদেশ জারি করা হয় এবং এ বিষয়গুলো তদন্তের জন্য একটি কমিটি গঠন করে বিএসইসি।
হাসান তাহের ইমাম ও চৌধুরী নাফিজ সরাফাত হচ্ছেন দেশের বৃহত্তম সম্পদ ব্যবস্থাপনা প্রতিষ্ঠান রেস প্রাইভেট লিমিটেডের প্রধান দুই কর্ণধার। রেস বর্তমানে ১২টি মিউচুয়াল ফান্ড পরিচালনা করছে, যার মধ্যে ১০টি হচ্ছে মেয়াদি মিউচুয়াল ফান্ড (Close-end Mutual Fund) ও বাকী ৩টি হচ্ছে বেমেয়াদি মিউচুয়াল ফান্ড (Open-end Mutual Fund)। প্রচলিত আইন লংঘন করে এবং নিয়ন্ত্রক সংস্থা বিএসইসির অনুমতি না নিয়ে স্টক এক্সচেঞ্জে তালিকাভুক্ত মিউচুয়াল ফান্ডগুলোর অর্থ দিয়ে মাল্টি সিকিউরিটিজ অ্যান্ড সার্ভিসেস লিমিটেডকে কিনে নিয়েছেন চৌধুরী নাফিজ সরাফাত ও হাসান তাহের ইমাম।